বন্যা, খরা, লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাতের ধান উদ্ভাবনের জন্য আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর  ঢাকা, ২৬ জুলাই, ফোকাস বাংলা নিউজ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, খাদ্য নিরাপত্তা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আশা করি, ২০১৩ সালের মধ্যে পুনরায় আমরা দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে পারবো। তিনি বন্যা, খরা, লবণাক্ততা সহিষ্ণু এবং পানি, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক কম লাগে এমন জাতের ধান উদ্ভাবনের জন্যে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।
সোমবার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে 'বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার-১৪১৫' বিতরণকালে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস। স্বাগত বক্তব্য দেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোস্তাক আহমেদ।
কৃষিতে অবদান রাখার জন্যে ১৪১৫ সালে ৫ জনকে স্বর্ণপদক, ৯ জনকে রৌপ্য পদক এবং ১৮ জনকে ব্রোঞ্জ পদক প্রদান করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান হলো_ আলহাজ্ব শেখ আফিল উদ্দিন এমপি, উষা রাণী গোস্বামী, এম এ মতিন, কৃষি তথ্য সার্ভিস ও আফতাব বহুমুখী ফার্মস লিঃ।
জাতীয় জীবনে কৃষির সর্বাধিক গুরুত্ব বিবেচনা করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে কৃষি উন্নয়নে জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ পুরস্কার 'রাষ্ট্রপতি পুরস্কার' প্রবর্তন করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশ শুধু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণই নয়, খাদ্য উদ্বৃত্ত দেশে পরিণত হবে। আমরা বিদেশে খাদ্য রফতানি করতে পারবো এমন লক্ষ্য নিয়েই সরকার কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। শেখ হাসিনা গবেষণা কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে বলেন, যারা গবেষণা কাজে সফল হবেন তাদেরকে সরকার পুরস্কৃত করবে।
শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলেছিল। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এসে পুনরায় দেশকে খাদ্যে-ঘাটতি দেশে পরিণত করে। আমরা চেয়েছিলাম খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে দেশকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে আর বিএনপি-জামায়াত জোট চেয়েছিলো খাদ্য ঘাটতি রেখে দেশকে পরনির্ভরশীল করে তুলতে। কারণ তাদের ধারণা, খাদ্য ঘাটতি থাকলে বিদেশী সাহায্য বেশি পাওয়া যায়। আমরা চাই, স্বাবলম্বী হয়ে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে। আর ওরা চায় ভিক্ষুকের জাতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে।
প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তিত জলবায়ু উপযোগী ফসলের জাত উদ্ভাবনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় আমাদের বিজ্ঞানীরা লবণাক্ততা সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। এর ফলে বোরো মৌসুমে উপকূলীয় এলাকায় খাদ্য উৎপাদন বেড়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, আমাদের বিজ্ঞানীরা ব্রি ধান-৫১ এবং ব্রি ধান-৫২ উদ্ভাবন করেছেন। এসব ধান বর্ষার পানিতে ডুবে গেলেও ফলন হবে এবং হাওরসহ উপকূলীয় এলাকায় জোয়ার-ভাটা থেকে রক্ষা পাবে। এছাড়াও ব্রি'র বিজ্ঞানীরা বোরো মৌসুমে আবাদযোগ্য সুগন্ধি জাতের বাংলামতি ধান উদ্ভাবন করেছেন বলে তিনি উল্লেখ করে বলেন, এই ধান বাশমতি চালের চেয়ে উন্নতমানের।
শেখ হাসিনা এসব ধান উদ্ভাবনকারী বিজ্ঞানীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পেলে আমাদের বিজ্ঞানীরা যে অনেক কিছু করতে পারেন, সমপ্রতি পাটের জন্মরহস্য উদঘাটনের মধ্যদিয়ে তা প্রমাণিত হয়েছে। পাটের মেধাস্বত্ত্ব এখন আমাদের অধিকারে থাকবে। পাশাপাশি বহুবিধ ব্যবহারসহ উচ্চফলনশীল ও বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশ উপযোগী নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করে পাটের সোনালী দিন ফিরিয়ে আনতে আমাদের বিজ্ঞানীরা সফল হবেন বলে আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী। তিনি কৃষিতে নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করার সময় পরিবেশের বিষয়টি খেয়াল রাখার পরামর্শ দিয়ে বলেন, পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কিছু শেষ পর্যন্ত কোনো উপকার বয়ে আনে না।
তিনি বলেন, কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষি উন্নয়নের ওপর নির্ভরশীল। কৃষিকে বিজ্ঞানসম্মত ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তোলার জন্যে কৃষিতে ভর্তুকি বাড়ানো, সারের দাম কমানো, কৃষকদের কৃষিকার্ড বিতরণ, দশ টাকার বিনিময়ে ব্যাংক একাউন্ট খোলাসহ তাঁর সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন।
১৯৯১_'৯৬ সালে বিএনপি সরকারের আমলে সারের দাবিতে আন্দোলনরত ১৮ জন কৃষককে হত্যার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা শুধু সারের দাম কমাইনি, বিতরণ ব্যবস্থায়ও যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছি। এখন কৃষককে আর সারের পিছনে ছুটতে হবে না। সারই কৃষককে খুঁজে নিবে।
বিগত বোরো মৌসুমে ব্যাপক বিদু্যৎ ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও সেচ সুবিধা নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শহরাঞ্চলের বিদু্যৎ রেশনিং করে গ্রামাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদু্যৎ সরবরাহ করা হয়েছে। যার ফলে আমরা বোরো মৌসুমে আশাতীত ফলন পেয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে মাত্রাতিরিক্ত বিদু্যৎ ঘাটতি মাথায় নিয়ে আমরা সরকারের দায়িত্ব নিয়েছিলাম। পাঁচ বছরে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে আমরা বিদু্যতের উৎপাদন বৃদ্ধি করেছিলাম। শুধু তাই নয়, জনগণের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিদু্যৎ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিলো। কিন্তু পরবতর্ীতে বিএনপি সরকার সেই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নতো করেই নাই, তাদের পাঁচ বছরের মেয়াদকালে জাতীয় গ্রিডে এক মেগাওয়াট বিদু্যতও সংযোজিত হয়নি। তারা যদি দেশের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিদু্যৎ উৎপাদন বাড়িয়ে যেতো তাহলে আজকে দেশে বিদু্যতের চরম ঘাটতি দেখা দিতো না। বিদু্যতের সমস্যার সমাধানে বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অচিরেই আমরা এই সমস্যার সমাধান করতে পারবো ইনশাআল্লাহ।
শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ যখনই সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে তখনই কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে কাজ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সালে দায়িত্ব পালনকালে রেকর্ড পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন করার জন্য জাতিসংঘ খাদ্য কৃষি সংস্থা সরকার প্রধান হিসেবে আমাকে মর্যাদাপূর্ণ 'সেরেস পুরস্কার'-এ ভূষিত করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষি ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার শীর্ষে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি, খরা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ একের পর এক বেড়েই চলেছে। সামপ্রতিককালে আমাদের এ অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলা আঘাত হানে। ঘূর্ণিঝড় আইলার ক্ষয়ক্ষতি আমরা এখনো কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়নি। তবে সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আকস্মিক বন্যা, বিলম্বিত বর্ষা, অতিবৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী খরা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা_ এর সবই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন কৃষি ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অন্যদিকে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে গরীব জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকাতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কারপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, এই পুরস্কার কৃষি এবং কৃষকের উন্নতিতে আরো ভূমিকা রাখবে। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্যে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নত একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করতে চাই। আর এই লক্ষ্য নিয়ে তাঁর সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
রৌপ্য পদকপ্রাপ্তরা হলেন_ ছফুরা বেগম, মো. হামিদুর রহমান, তারাপদ বালা, মো. সিদ্দিকুর রহমান (ময়েজ), সার্জেন্ট (অব.) মো. সামছউদ্দিন (বীর মুক্তিযোদ্ধা), কে এম আব্দুর রউফ (বাবলু), আলহাজ মো. ফসিয়ার রহমান, মো. রবিউল ইসলাম ও আলহাজ্ব মো. ওমর ফারুক চৌধুরী।
ব্রোঞ্জ পদকপ্রাপ্তরা হলেন_ মো. নুরুল ইসলাম, মো. এনামুল হক, হাবিবুর রহমান চৌধুরী, মো. মামুনুর রশীদ, মো. সাইফুল ইসলাম, মো. আঃ করিম, এম এ মতিন (মতিন সৈকত), সৈয়দ মোখলেছুর রহমান জিন্নাহ, শাহ নাজরী ইমাম হাসান (নজর), রবীন্দ্রনাথ মলি্লক, মো. আবদুল বারী (আম), জিয়ালা ঘোষপাড়া প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি লিঃ, মো. আব্দুল মোত্তালেব, জামাল উদ্দীন আহমদ, সমীরণ দত্ত, মো. বাবুল হোসেন, মো. ইসমাইল হোসেন বাদশা মন্ডল ও দেলোয়ারা খাতুন।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ফোকাস বাংলা/শা খা বর্ণ
|