Saturday, 24 June 2017


মধ্যবিত্তের টানাপড়েনের ঈদ :স্বল্প আয়ের ক্রেতার ভিড়

ঢাকা,১৮জুন,ফোকাস বাংলা নিউজ:অন্যান্যবারের মতো এবারও ময়মনসিংহে গ্রামের বাড়িতে মা-বাবার সঙ্গে ঈদ করবেন ঢাকার শাহজাদপুরে বাটারফ্লাইয়ের শোরুমের সহকারী ম্যানেজার আসাদুজ্জামান মানিক। বাড়ি ফেরার আগে স্ত্রী-পুত্রের জন্য নতুন জামাকাপড় কেনা হলেও মা-বাবারটা বাকি রয়ে গেছে।তাই রোববার বিকেলে হালকা বৃষ্টি মাথায় নিয়ে চলে আসেন শাহজাদপুরে কয়েক দশকের পুরনো বিপণিবিতান হাজী জমরউদ্দিন সুপারমার্কেটে। ২০০ টাকা দিয়ে একটি লুঙ্গি কিনলেন বাবার জন্য। আর মায়ের জন্য শাড়ি কিনলেন ৪৫০ টাকায়। একটি শপিং ব্যাগে পণ্য দুটি ভরে এই ক্রেতার হাতে তুলে দিলেন দোকানি। ব্যাগ হাতে নিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মানিক বললেন, যাক বাবা, কম বাজেটের মধ্যে সবার কেনাকাটা শেষ হলো। এ যাত্রায় কোনো রকমে বাসের হাতলটা ধরতে পারলেই হয়। একবারে ময়মনসিংহ। কষ্টের কথা না যায় বলা, না যায় সওয়া’Ñ এমন মন্তব্য বেরিয়ে এলো আবদুল হালিমের মুখ থেকে। তিনি একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তা। মা, স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে তার সংসার। চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। মাসে বেতন সর্বসাকুল্যে ৪০ হাজার টাকা। থাকেন ঢাকার বাসাবো এলাকায়।দুই সন্তানের মধ্যে ছেলে অষ্টম আর মেয়ে পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। ভালো ফলের জন্য দু’জনেরই প্রয়োজন প্রাইভেট টিউটরের। কারণ একজন দেবে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি), অন্যজন দেবে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি)। প্রাইভেট টিউটর রাখা হয়েছে তাদের জন্য।প্রতি মাসে ছেলেমেয়েদের স্কুল ও প্রাইভেট টিউটরের বেতন মিলিয়ে খরচ ১০ হাজার টাকা। বাসাভাড়া দিতে হয় ১০ হাজার টাকা। অসুস্থ মায়ের ও নিজেদের প্রয়োজনীয় ওষুধের পেছনে যায় ৩ হাজার টাকা।পানি, গ্যাস বিদ্যুৎ, নাইটগার্ড, ডিশ অ্যান্টেনা, ময়লা পরিষ্কারের জন্য সিটি করপোরেশনের বিলসহ অন্যান্য মিলিয়ে ইউটিলিটি চার্জ দেন আড়াই হাজার টাকা। অফিসে যাতায়াত ও দুপুরের খাবার হিসেবে নিজের হাত খরচ রাখেন মাসে ৩ হাজার টাকা।অবশিষ্ট থাকে সাড়ে ১২ হাজার টাকা। তা দিয়ে পরিবারের সবার খাওয়া-দাওয়ার জন্য মাসের বাজার ও অন্যান্য খরচ মেটাতে হয় আবদুল হালিমকে। নিজের সংসারের হিসাব তুলে ধরে উল্টো জানতে চান- ‘কী খাই, তা আপনিই বলেন? আবদুল হালিম বললেন, গত ৪ জুন মে মাসের বেতন পেয়ে সব পাওনা মিটিয়ে বাজার করেছি। জুন মাসের ১৫ দিন চলে গেছে, বেতন পেতে সামনে আরও ১৮ দিন পার করতে হবে। এ মাসে বাড়তি আয় নেই, চলছে রোজা। এজন্য বাড়তি খরচের কথা বললাম না। তবে সামনে ঈদ। জুনের বেতন পাবো জুলাই মাসের ৪ অথবা ৫ তারিখে। তবে এ মাসে ঈদ বোনাস পাবো ২০ হাজার টাকা। এই টাকায় দুই ছেলে মেয়ে, স্ত্রী ও মায়ের জন্য নতুন কাপড় কিনতে হবে। নিজের কথা পরে বলি। কারণ বছরের এই এক ঈদেই একটু ভালো কাপড় কেনা হয়। যা দিয়ে সারাবছর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বা বেড়ানোর সময় ব্যবহার করা লাগে। এরপর থাকে ঈদের বাড়তি কেনাকাটা, জাকাত-ফিতরা। তারপর যদি ঈদের সময় গ্রামের বাড়ি যেতে হয়, সে খরচও মেটাতে হবে এই বোনাসের ২০ হাজার টাকা থেকেই।এবার তার প্রশ্নÑ‘বলেন, কেমন ঈদ আনন্দ হবে আমার ও আমার পরিবারের?ঈদের জন্য আয়োজন করতে গিয়ে টানাপড়েনে পড়ে আক্ষেপের সুরে আবদুল হালিম বলেন, জানেন, উপহার দিতে বাড়তি খরচ হবে বলে কোনও আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের বাসায় বা কোনও অনুষ্ঠানে যাই না। কোনও বিয়ে, জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও যাই না। এই হলো আমাদের জীবন। এর মধ্যেই আনন্দ খুঁজতে হয়। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে রাজধানীতে এমন মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। যাদের মাসিক আয় ৪০ হাজার টাকার নিচে তাদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। বর্তমানে মধ্যবিত্তের সব ব্যয় নির্বাহ করে সমাজে টিকে থাকাটাই কঠিন। বর্তমান বাজার বাস্তবতায় এ শ্রেণির মানুষের অবস্থা খুবই নাজুক। এই মানুষগুলো কোনোরকম পেটে-ভাতে টিকে আছেন।এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, যতই বলা হোক মানুষের আয় বেড়েছে, আসলে তা দিয়ে দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো খুবই কষ্টসাধ্য। ফলে কষ্টের বিষয়টি থেকেই যায়। একজন অসহায় ও গরিব মানুষ সবার কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাততে পারেন, কিন্তু মধ্যবিত্ত মানুষেরা তা পারেন না। ফলে তার কষ্টের কথা না বলা যায়, না জানা যায়।একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম। সম্প্রতি তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মধ্যম আয়ের দেশ, এই ধারণা ভিত্তিহীন। আবার সরকারের পক্ষ থেকে যে মাথাপিছু আয়ের কথা বলা হয়, এগুলো সব ভুল কথা। একজনের আয় ১৯ লাখ আর আরেক জনের আয় ১ লাখ মিলিয়ে যদি বলি দু’জনের মাথাপিছু আয় ১০ লাখ তাহলে তো আর সঠিক ধারণা পাওয়া যাবে না।অধ্যাপক ড. নেহাল করিম আরও বলেন, গাড়ির ট্যাক্স কমানো হয়েছে, এতে সাধারণ মানুষের কোনও উপকার হবে না। কারণ দাম কমালেও গ্রামের একজন কৃষক কখনও গাড়ি কিনতে পারবে না। সম্প্রতি বলা হচ্ছেÑ দেশ ডিজিটাল হচ্ছে, ফ্লাইওভার, সেতু তৈরি হচ্ছে। এগুলো দেশের সাধারণ জনগণের কোনও উপকারে আসবে না। মধ্যবিত্ত বা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়াতে হলে দরকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ব্যাপকভাবে বিদ্যুতায়ন, কৃষিপণ্যের দাম বৃদ্ধি। যদি এসব করা সম্ভব হয় তাহলে মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার মান বাড়বে। সাধারণ মানুষের উপকার হবে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জীবনযাত্রার মান অনুযায়ী এখন ব্যয় বেশি। এই ব্যয় মেটানোর আয় নেই মানুষের। আর মধ্যবিত্তরা তো আছেন মহাবিপদে। তারা কোথাও যেতেও পারেন না। বাসায় ভালো খেতেও পারেন না। এ কথা কাউকে বলতেও পারেন না। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে মানুষের আয় বাড়াতে হবে। নিত্যপণ্যের দাম রাখতে হবে নিয়ন্ত্রণে।ভাটারায় একটি মোটরসাইকেল সারাইখানায় কাজ করেন বেলাল। গতকাল শনিবার স্ত্রী আর এক-দেড় বছরের মেয়েকে নিয়ে কেনাকাটা করতে এসেছিলেন হাজী জমরউদ্দিন সুপার মার্কেটে। গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীতে। মা-বাবা বেঁচে নেই। তাই শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে ঈদ করতে গ্রামের বাড়ি যাবেন। শাশুড়ির জন্য শাড়ি ও শ্বশুরের জন্য লুঙ্গি কিনবেন। বিক্রেতার সঙ্গে ১০-১৫ মিনিট ধরে দর-কষাকষি করে শেষ পর্যন্ত হাঁটাই দিলেন। দু-পা বাড়াতেই ডাক দিলেন বিক্রেতা, ‘নিয়া যান ভাই। কী আর করা, বৃষ্টির দিন! বেচা-বিক্কিরি নাই। এবার স্ত্রীর জন্য থ্রি-পিস আর জুতা কিনতে ঢুকেপড়লেন মার্কেটের অন্য গলিতে। জামা-জুতা পছন্দ করা নিয়ে কয়েক দফা ঝগড়া করলেন স্ত্রীর সঙ্গে। অবস্থা বেগতিক দেখে বেলালের সঙ্গে কথা বলতে চেষ্টা করা সমীচীন হবে কি না এমনটা ভাবতে ভাবতেই বেলাল বলে বসলেন, ‘দ্যাখেন তো ভাই কী যন্ত্রণা! সেলোয়ার পছন্দ হয় তো কামিজ পছন্দ হয় না। আবার কামিজ পছন্দ হয় তো টাকায় কুলায় না। ’ এই বলে আবারও জামা-কাপড় দেখতে শুরু করেন। সাড়ে তিন শ টাকায় একটি থ্রি-পিস কিনে হনহন করে বেরিয়ে পড়লেন মার্কেট থেকে।একটি গোয়েন্দা সংস্থায় ছোটখাটো চাকরি করেন মিজানুর রহমান। স্ত্রী আর বোনকে নিয়ে এসেছেন ওই মার্কেটে। বেছে বেছে কয়েক গজ কাপড় কিনলেন স্ত্রী আর বোনের পোশাক বানানোর জন্য। দীর্ঘক্ষণ ধরে বৃষ্টি হওয়ায় মার্কেট থেকে বের হতে পারছিলেন না। কথায় কথায় এই প্রতিবেদককে বললেন, সামনে সুবাস্তু (নজর ভ্যালি) মার্কেটে ঢুকছিলাম। এই যে পাশে কনফিডেন্স শপিং সেন্টার, এইটাতেও ঢুকছিলাম। কিন্তু পছন্দসই জামাকাপড় পাই নাই। যাও আবার পছন্দ হয়, দাম অনেক চড়া। টিনশেডের এই মার্কেটটিতে হাতে গোনা ২৭-২৮টি দোকান থাকলেও ঈদে স্বল্প বাজেটে পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটার সব ধরনের পণ্যই রয়েছে এখানে। কম দামে শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রি-পিস, কাটা কাপড়, প্লাস্টিকের জুতা, চামড়ার জুতার আদলে তৈরি করা রেকসিনের জুতা, ভ্যানিটি ব্যাগ, এমিটেশনের গয়না, বাচ্চাদের জামা-কাপড়সহ সব কিছুই মেলে এই মার্কেটে। আর সে সুবাদে স্বল্প আয়ের ক্রেতারা ভিড় জমান এখানে।মার্কেটের তামীম বস্ত্র বিতানের স্বত্বাধিকারী মো. আল-আমীন মিয়া জানান, তাঁর দোকানে সর্বোচ্চ ৪০০-৪৫০ টাকা দামের লুঙ্গি আছে। বয়স্ক নারীদের জন্য শাড়ি আছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। একই মার্কেটের ইয়াসিন বস্ত্র বিতানে জাকাতের শাড়ি-লুঙ্গিও বিক্রি হচ্ছে।প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ঢাকা শহরে শপিং মল ও মার্কেট রয়েছে প্রায় সাড়ে চার শ। এসব মার্কেটের বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত ক্রেতাদের জন্য। কিন্তু হাজী জমরউদ্দিন মার্কেটটি মূলত নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য।ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক ও মহানগর দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ঢাকা শহরে অধিকাংশ মানুষই ঢাকার বাইরের। এরা সবাই কমবেশি মা-বাবার সঙ্গে ঈদ করার জন্য গ্রামের বাড়ি যায়। আর যাওয়ার আগে সবার জন্য কেনাকাটা করে। শহরে যেমন উচ্চবিত্তদের জন্য বড় শপিং মল আছে তেমনি গরিবদের জন্য গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররমসহ হকার্স মার্কেটও আছে। যেসব মার্কেটের নাম হয়তো সবাই ঠিকমতো জানেও না। তবে কম দামে পণ্য কেনার জন্য অনেকেই আসে এসব মার্কেটে।
প্রতিবেদক/জিএম/ফোকাস বাংলা/১৭৩০ ঘ.

নাটোরে যুবলীগ কর্মীদের গণপিটুনীতে এক গ্রামের ২০জন আহত
ওষুধের অনিয়ম প্রতিরোধে কঠোর আইন করা হচ্ছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
সারাদেশে সড়কে প্রাণ গেল ৮ জনের